The news is by your side.

ধানের শীষের প্রার্থীরা সক্রিয় ১১৭ আসনে

152

হাতে ধানের শীষের তোড়া, মাথায় ধানের শীষ প্রতীকসংবলিত টুপি পরে কেউ পেছনে মানুষের সারি নিয়ে গণসংযোগ করছেন; কেউ আলিঙ্গন করছেন ভোটারদের সঙ্গে—এমন দৃশ্য প্রতিদিনই দেখা মিলছে টেলিভিশনের পর্দায় বা পত্রপত্রিকায়। নানা বাধাবিপত্তি উপেক্ষা করেই একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে কমপক্ষে ১১৭টি আসনে সক্রিয় আছেন জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট ও ২০ দলীয় জোটভুক্ত ধানের শীষ প্রতীকের প্রার্থীরা। তাঁদের মধ্যে অনেকেই বিএনপি ও এর মিত্র বিভিন্ন দলের প্রথম সারির নেতা। তাঁরা নিজ নিজ নির্বাচনী এলাকা চষে বেড়াচ্ছেন দিন-রাত। আবার অনেকে আগে থেকেই তৃণমূলে আছেন শক্ত অবস্থানে। অন্যদিকে একই প্রতীকের বাকি প্রার্থীরা নিজের বা স্থানীয় সাংগঠনিক দুর্বল অবস্থানের কারণে অন্যদের মতো হামলা-বাধা উপেক্ষা করে মাঠে থাকতে পারছেন না। তাঁরা কেবলই প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীদের বিরুদ্ধে নির্বাচন কমিশন (ইসি) বা সংবাদমাধ্যমের কাছে নানা অভিযোগ করছেন। এ ছাড়া ধানের শীষ প্রতীকের ১৫ জন প্রার্থী বিভিন্ন মামলায় কারাগারে আছেন। তাঁদের মধ্যে কারো কারো কর্মীরা এলাকায় প্রার্থীর পক্ষে কাজ করছে, আবার কারো কর্মীরাও আছে নীরব।

কোনো কোনো রাজনীতি বিশ্লেষকের মতে, ধানের শীষের প্রার্থীরা মাঠে থাকতে পারছেন না বলে ঢালাওভাবে যে অভিযোগ করা হচ্ছে, তাতে বরং নিজেদের সাংগঠনিক দুর্বলতাই সামনে চলে আসে। যাঁরা মাঠে টিকে আছেন তাঁদেরও হেয় করা হয়।

বিভিন্ন এলাকায় খোঁজ নিয়ে দেখা গেছে, যেসব আসনে ধানের শীষের প্রার্থীরা বেশি নিষ্ক্রিয়, সেখানে আগে থেকেই ওই প্রার্থীদের সঙ্গে বিএনপির বা জোটভুক্ত অন্য দলের স্থানীয় নেতাকর্মীদের যোগাযোগে ঘাটতি, দলীয় কোন্দল, প্রার্থিতা নিয়ে অসন্তোষসহ আরো কিছু বিষয়ে নাজুক অবস্থা রয়েছে। ফলে ভোটের সময় তাঁরা কর্মীদের মনে সাহস জোগাতে পারছেন না। এ ছাড়া কর্মীদের মাঠে নামানোর জন্য আর্থিক সহায়তাও দিতে পারছেন না কেউ কেউ। পাশাপাশি কোথাও কোথাও শুধুই ভোটের দিন নীরব ভোট বিপ্লবের আশায় ঘরে বা আড়ালে বসে আছেন প্রার্থীরা। কেউ কেউ আগেই হাল ছেড়ে দিয়েছেন।

রাষ্ট্রজ্ঞানী ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক এমাজউদ্দীন আহমদ কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘ঢালাওভাবে সব এলাকায়ই যে পরিবেশ খারাপ সেটা বলা ঠিক নয়। পরিস্থিতির কারণে অনেকেই ভীতসন্ত্রস্ত হয়ে কাজ করতে পারছেন না। এ ক্ষেত্রে হয়তো আগে থেকে তাঁদের আসনগুলোতে নিজেরাও খুব একটা গুছিয়ে বা সংগঠিতভাবে নামতে পারেননি। এক ধরনের দুর্বলতাও কাজ করতে পারে। আর যাঁরা আগে থেকেই নিজ এলাকায় সাংগঠনিকভাবে শক্তিশালী ছিলেন, তাঁরা কিন্তু ঠিকই সব বাধা অতিক্রম করে নির্বাচনে টিকে আছেন। এ্যানি, গয়েশ্বর রায়, খোকন, হাবিবদের মতো নেতারাও যেখানে মার খাচ্ছে; এগুলো অবশ্য অন্যদের জন্য ভয়ের ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে।’ তিনি বলেন, ‘রাজনীতিতে সাংগঠনিক শক্তিও একটা বড় ব্যাপার। প্রার্থীর নিজস্ব অবস্থানও থাকতে হয়।’

নির্বাচন পর্যবেক্ষণকারী সংস্থা জানিপপের বিভাগীয় সমন্বয়কারী এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শান্তি ও সংঘর্ষ অধ্যয়ন বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. সাবের হোসেন চৌধুরী কালের কণ্ঠকে বলেন, নির্বাচনী মাঠে যাঁরা প্রার্থিতা করতে নামেন তাঁদের দলীয় অবস্থানের পাশাপাশি ব্যক্তিগত অবস্থানও একটা ফ্যাক্টর হয়ে দাঁড়ায়। বিশেষ করে এলাকায় জনসম্পৃক্ততা ও দলের সঙ্গে স্থানীয় কর্মীদের যুক্ত করার দক্ষতাও মুখ্য হয়ে দাঁড়ায়। এর সঙ্গে বিরোধী রাজনীতিতে থাকলে বাড়তি চাপ তো থাকবেই। এসব কিছু সমন্বিতভাবে যাঁরা মোকাবেলা করতে পারছেন তাঁরাই মাঠে আছেন। আর যাঁরা ওই সব ক্ষেত্রে দুর্বল তাঁরা মাঠে টিকতে পারছেন না—এটাই বাস্তবতা। এককথায় নিজেদের বহু রকম দুর্বলতার কারণেই মাঠে নামতে পারছেন না ধানের শীষের বেশির ভাগ প্রার্থী।’

ড. সাবের বলেন, ‘বিএনপি যেহেতু আগে থেকেই তাদের দলীয় শীর্ষ দুই নেতার কারাদণ্ড, কারাগার ও দেশের বাইরে থাকার মতো এক ভঙ্গুর অবস্থায় উপনীত হয়েছে, তাই নির্বাচনের সময় ওই অবস্থা কাটিয়ে উঠতে পারছে না। অনেকে নিজ নিজ দক্ষতায় পরিস্থিতি উতরে যাওয়ার চেষ্টা করছেন, অনেকে সেই চ্যালেঞ্জেও ধোপে টিকছেন না।’

বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান ডা. এ জেড এম জাহিদ হোসেন কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমাদের নিজস্ব পর্যবেক্ষণেও আমরা দেখতে পাচ্ছি, আমাদের অনেক প্রার্থী একদিকে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর, অন্যদিকে সরকারি দল আওয়ামী লীগের কর্মীদের অত্যাচার-নিপীড়ন, হামলা-মামলা-গ্রেপ্তার উপেক্ষা করে মাঠে পড়ে থেকে নির্বাচনী প্রচার-গণসংযোগ অব্যাহত রেখেছেন। বাকি অনেকে হয়তো এসবের ভয়ে বেশি ভীতসন্ত্রস্ত্র হয়ে মাঠে নামার সাহস পাচ্ছেন না। তবে আমাদের দৃঢ় বিশ্বাস, ভোটের দিন এই চিত্র পাল্টে যাবে। ভোটাররা কেন্দ্রে যেতে পারলে, ভোট দিতে পারলে নীরব ভোট বিপ্লবের মাধ্যমে আমরাই বিজয়ী হব।’

ডা. জাহিদ বলেন, ‘দেশের সব জায়গায় যে একই অবস্থা বিরাজ করছে সেটা বলব না, অনেক এলাকায় খুবই ভালোভাবে আমাদের প্রার্থীরা ভোটারদের ঘরে ঘরে যাচ্ছেন।’ তিনি আরো বলেন, ‘এবারের নির্বাচন অংশগ্রহণমূলক একটি নির্বাচন হচ্ছে, কিন্তু নিরপেক্ষতা ও গণতান্ত্রিক অধিকারের প্রশ্নে নির্বাচন কমিশন সুষ্ঠু ও অবাধ পরিবেশ বজায় রাখতে ব্যর্থ হচ্ছে।’

কালের কণ্ঠ’র নিজস্ব তথ্যব্যাংক অনুসারে, ১০ ডিসেম্বর থেকে ২৩ ডিসেম্বর পর্যন্ত সারা দেশে সহিংসতার ২৮৭টি ঘটনার মধ্যে ১০৯টি হামলা, ৬৮টি ভাঙচুর, ৩৩টি অগ্নিসংযোগের শিকার হয়েছে ধানের শীষের প্রার্থী থেকে শুরু করে কর্মীরা এবং তাদের বিভিন্ন সম্পদ। এসব ঘটনায় আহত হয়েছে বিএনপির ৭১২ জন। সহিংসতার ঘটনায় নৌকা প্রতীকের প্রার্থী, তাঁদের সম্পদও যেমন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, আহতও হয়েছে প্রায় ৩০০ জন। বিএনপির কেউ নিহত না হলেও আওয়ামী লীগের দুজন নিহত হয়েছে। বিএনপির প্রায় দ্বিগুণ অগ্নিসংযোগ হয়েছে আওয়ামী লীগের বিভিন্ন সম্পদে। এমন অবস্থার মধ্যেও শতাধিক আসনে বিএনপি ও ঐক্যফ্রন্টের প্রার্থীরা নির্বাচনী মাঠে সক্রিয় আছেন। এমনকি গতকাল বুধবারও ১১৪টি আসনে নির্বাচনী মাঠ চষে বেড়িয়েছেন ধানের শীষের প্রার্থীরা।

ওই তথ্য অনুসারে ঠাকুরগাঁও ও বগুড়ায় নিয়মিত নির্বাচনী প্রচার ও গণসংযোগে আছেন বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ও তাঁর কর্মীরা। গতকালও তিনি বগুড়ায় নিজের আসনে নির্বাচনী কর্মসূচিতে অংশ নেন। কুমিল্লায় ড. খন্দকার মোশারফ হোসেন একাধারে দুটি আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন সরব প্রচারের মধ্য দিয়ে। ঢাকায় মির্জা আব্বাস ও তাঁর স্ত্রী আফরোজা আব্বাসকে গতকাল প্রচারে দেখা না গেলেও প্রতীক বরাদ্দের পর থেকে নানা বাধা উপেক্ষা করে প্রায় দিনই তাঁরা প্রচারে অংশ নিয়েছেন। একইভাবে ঢাকায় নবী উল্লাহ নবী প্রায় প্রতিদিনই মাঠে থাকছেন। পোস্টার ব্যানারও আছে তাঁর আসনে। মোস্তফা মোহসিন মন্টু ও অ্যাডভোকেট সুব্রত চৌধুরীর গণসংযোগের ছবিও প্রতিদিন ফলাও করে প্রকাশিত হচ্ছে গণমাধ্যমে। চট্টগ্রামে আব্দুল্লাহ আল নোমান, আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী, বগুড়ায় নাগরিক ঐক্যের মাহমুদুর রহমান মান্না, রাজশাহীতে মিজানুর রহমান মিনু, লক্ষ্মীপুরে শহীদ উদ্দীন চৌধুরী এ্যানি, পঞ্চগড়ে নওশাদ জমির, দিনাজপুরে রেজাওয়ানুল হক, লালমনিরহাটে আসাদুল হাবিব দুলু, নওগাঁয় আলমগীর কবির, সামসুদ্দোহা খান, বগুড়ায় কাজী রফিকুল ইসলাম, গোলাম মোহাম্মদ সিরাজ, চাঁপাইনবাবগঞ্জে শাহজাহান মিয়া, আমিনুল ইসলাম, হারুনুর রশিদ, শেরপুরে সানসিলা জেবরিন, ময়মনসিংহে সামসুদ্দীন আহম্মেদ, খুররম খান চৌধুরী, বরিশালে অ্যাডভোকেট জয়নুল আবেদীন, মজিবর রহমান সরোয়ার, আবুল হোসেন খান, বরগুনায় খন্দকার মাহবুবসহ ১১৭ জন প্রতিদিনই দলীয় নেতাকর্মী নিয়ে বিভিন্ন রকম নির্বাচনী কার্যক্রম পরিচালনা করছেন। এঁদের মধ্যে কয়েকজন প্রার্থী আহত হয়েও মাঠ ছাড়েননি। এমনকি রংপুর-৬ আসনে আওয়ামী লীগের সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রতিদ্বন্দ্বী জেলা বিএনপির সভাপতি সাইফুল ইসলাম সকাল থেকে রাত পর্যন্ত ঘুরে বেড়াচ্ছেন এলাকায়। যদিও আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরের প্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপির প্রবীণ নেতা ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ বিভিন্ন অভিযোগ তুলে নির্বাচনী গণসংযোগ থেকে সরে দাঁড়ানোর ঘোষণা দিয়েছেন।

রংপুর-৬ (পীরগঞ্জ) আসনে বিএনপির প্রার্থী সাইফুল ইসলাম বলেন, ‘আমার এখানেও বিভিন্ন বাধা আছে, তবু আমি মাঠ ছেড়ে যাইনি। আমার বড় শক্তি আমার জনগণ। আর এই ভোট তো আন্দোলনের অংশ হিসেবে নিয়েছি। এখানে ভয় পেয়ে ঘরে বসে থাকলে তবে আর ভোটে নেমেছি কেন!’

প্রচারে সক্রিয় প্রার্থীদের অন্যতম ঢাকা মহানগর দক্ষিণ বিএনপির সহসভাপতি নবী উল্লাহ নবী বলেন, ‘এলাকার ভোটাররাই আমার সব। কোনো কিছুই আমাকে দমাতে পারে না। কারণ আমি এখানে দলকে ৩৮ বছর ধরে সুসংগঠিত করে রেখেছি। তাই আমি যখন যত মানুষ ডাকব, তারাই সব বাধা পেরিয়ে আমার জন্য কাজে নেমে যায়। অন্য জয়গায় হয়তো এসব ক্ষেত্রে দুর্বলতা রয়েছে।’

বিএনপির একজন সিনিয়র নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘বর্তমান প্রেক্ষাপটে নির্বাচন করতে যখন আমরা নেমেছি তখন আমাদেরকে হামলা-মামলা অত্যাচারের ঝুঁকির বিষয়টি মাথায় রেখেই নামতে হয়েছে। মনোনয়নের সময় সবাই যার যার এলাকায় নিজের অবস্থান খুব শক্ত বলেই আমাদের জানিয়েছে। অনেকে বিভিন্ন ধরনের চ্যালেঞ্জ পর্যন্ত দিয়েছে। এখন তাদের অনেককেই দেখছি ঘর থেকে বের হচ্ছে না। এসব বিষয় আমাদের নজরে রয়েছে। ভোটের পরে এগুলোও আমরা পর্যালোচনা করব।’ ওই নেতা জানান, ভোটের সময় নানা কৌশল নিতে হয়। কিন্তু কেউ কেউ এলাকাছাড়া হয়ে থেকে কিংবা মোটেই পোস্টার ব্যানার না লাগিয়ে ভোট করবেন—এটা তো আমাদের দলীয় কোনো কৌশলও নয়। এটা যাঁরা করছেন তাঁরা নিজেদের দায়িত্বেই করছেন।

প্রচার ও নির্বাচনী কার্যক্রমে কেন দেখা যাচ্ছে না জানতে চাইলে ঝালকাঠি-২ আসনে বিএনপির প্রার্থী জীবা আমিনা খান কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘দুই দফায় হামলার শিকার হয়েও গ্রামের বিভিন্ন স্থানে গণসংযোগ করছি। তবে ঝালকাঠি ও নলছিটি শহরে প্রচার করতে পারছি না। শহরে গেলেই প্রশাসনও বাধা হয়ে দাঁড়ায়।’ সূত্র: কালেরকন্ঠ।

Leave A Reply

Your email address will not be published.