Business is booming.

স্বপ্নের সান্দাকফু: পাহাড়জুড়ে তুমি ছিলে (শেষ পর্ব)

(প্রিয়.কম) কালই সান্দাকফু দর্শনের শেষ দিন। প্রায় সারা দিন বৃষ্টিতে ভিজে টুমলিংয়ে পৌঁছানোর পর অনেকটা অচেতন হয়ে গিয়েছিলাম। চেতনা ফিরে পেয়ে কোনো মতে কাপড় বদলে ফেলেই গরম পানি খেতে লাগলাম অনবরত। এটাই নতুন কোনো বিপদে পড়া থেকে বেঁচে থাকার একমাত্র উপায়। তাই আশ্রয় নেওয়া বাড়ির সবাই অনবরত বলতে লাগল, কোনোভাবেই যেন গরম পানি খাওয়া বন্ধ না করি, তাতে করে জ্বর চলে আসতে পারে, যেটা হবে খুবই বিপজ্জনক।

বিছানায় এলিয়ে পড়তেই ঢলে পড়লাম ঘুমের কোলে। আর বৃষ্টি? এতক্ষণ যেন টিপটিপ করে পড়ছিল সেই তুমুল মুষলধারে বৃষ্টিই! কারণ এরপর যে হারে আর পরিমাণ বৃষ্টি পড়তে আরম্ভ করল যে, মাঝে মাঝে ভয় লাগতে লাগল পাহাড়ধস না শুরু হয়ে যায় আবার। আবারও ঘুমে তলিয়ে গেলাম।

রাত ৯টার দিকে ডিনারের ডাক পড়ল। অবশ্য আগেও ডেকেছিল। কিন্তু ঘুমিয়ে থাকায় আর উঠা হয়নি। এখন না খেলে সারা রাত না খেয়েই থাকতে হবে, সবাই ঘুমিয়ে যাবে বলে। তাই উঠতেই হলো অবশেষে।

হায়রে বৃষ্টি! বৃষ্টি কাকে বলে, কত প্রকার আর কী কী, সেটা পেয়েছি এই টুমলিংয়ে আবার ফিরে এসে। প্রাণের সমান প্রিয় উডল্যান্ড জোড়া ঝুলিয়ে রাখা হলো ঠিক কাঠের জ্বলন্ত চুলার উপর, যেন সকাল হতে হতে আগুনের উত্তাপে শুকিয়ে যায়, টানা ৬ ঘণ্টার বৃষ্টিতে চুপচুপে হয়ে যাওয়া প্রিয় জুতা জোড়া।

কোনো মতে একটু খেয়ে আর হাতে করে আবারও গরম পানি আর কফি নিয়ে উঠে পড়লাম দোতলায়, ঢুকে পড়লাম নরম বিছানার কোমল আর গরম কম্বলের ভেতর। এইবার ভয় কেটে গিয়ে কিছুটা আনন্দ হতে লাগল ভেতর ভেতরে।

মনে পড়তে লাগল, ঠিক এমন করেই একটি রাত কল্পনা করেছিলাম কোনো এক কালে। এক পাহাড়ের চূড়ায় থাকব কোনো এক টিনের চালার বাড়িতে, যেখানে রাতভর ঝুম বৃষ্টি ঝরবে অঝোর ধারায়, টিনের চাল অবিরত গাইবে বৃষ্টির গান, পাহাড়ের ঝড়ো বাতাস কানে এসে লাগবে শো শো করে, নরম বিছানায় আধশোয়া হয়ে রইব বাইরের দিকে তাকিয়ে, দেখব মৃদু আলোয় বৃষ্টির ফোঁটাগুলোকে রুপালি ফোঁটা হয়ে ঝরতে। হাতে এক মগ ধোঁয়া উঠা ব্ল্যাক কফি, শুকনো খাবারের সমারোহ, পাশে বেজে চলবে প্রিয় কোনো সুর, আর আমার পাশে থাকবে সে, আমার প্রেয়সী। রাতভর দুজনে উপভোগ করব পাহাড়ের চূড়ায় টিনের চালে অঝোর ধারায় ঝরে পড়া বৃষ্টির গান। সে হবে এক অপার্থিব রাত্রি, অনন্তকাল যা ছুঁয়ে যাবে মন-প্রাণ আর মনন।

টুমলিংয়ের পাহাড়চূড়ার টিনের চালের ঘরের সেই রাত্রি অনেকটা কল্পনার মতোই ছিল। শুধু একটু অপূর্ণতা এই যা। তবে এইটুকু অপূর্ণতা আমি ভালোবাসি খুব। সব পেয়ে গেলে, কিছু না পাওয়ার আক্ষেপ থাকবে না। তাই আবারও যেন রোমাঞ্চের খোঁজে ফিরতে পারি পাহাড়ে পুষে রেখে কিছু অপূর্ণতা। এটা একটা বিলাসিতা আমার।

মনে মনে, আশপাশে ছিল সেইজন, যে পাহাড় ভালোবাসে, পাহাড়ের কাছে সপে দেয় নিজেকে, পাহাড় যাকে পাগল করে দেয়, যে পাহাড়ে হারাতে যায় সবসময়।

একা একাও দারুণ, অদ্ভুত আর অন্যরকম একটি বৃষ্টিস্নাত পাহাড়ি রাত উপভোগ করেছি সবটুকু আকাঙ্ক্ষা নিয়ে। একটি পূর্ণতা পেয়েছি কল্পনাকে বাস্তবতার সাথে হুবহু মিলিয়ে দেখার, একটি অসম্ভব গল্প পেয়েছি যেটা শুধু অনুভবের আর উপভোগের। সেই গল্পটা লিখব না কখনো, লেখা হবে না কখনো, লিখতেও চাই না কখনো। সেই গল্পটা থাকুক নিজের একান্ত আনন্দ, ভিন্ন সুখ আর অনন্ত আবেশ হয়ে।

পূর্ববর্তী পর্বগুলো 

স্বপ্নের সান্দাকফু: স্বপ্নের শুরু (পর্ব-১) 

স্বপ্নের সান্দাকফু: পাহাড় ও পারিবারিক সংকট (পর্ব-২)

স্বপ্নের সান্দাকফু: ট্রেকিং সঙ্গী ও ইমিগ্রেশন  (পর্ব-৩)

স্বপ্নের সান্দাকফু: প্রেয়সীর আলিঙ্গনে (পর্ব-৪)

স্বপ্নের সান্দাকফু: টংলু ভ্যালির প্রেমে (পর্ব-৫)

স্বপ্নের সান্দাকফু: স্বপ্নের টুমলিং (পর্ব-৬)

স্বপ্নের সান্দাকফু: ভালোবাসার ভারে, তুষার ঝড়ে পড়ে (পর্ব-৭)

স্বপ্নের সান্দাকফু: গাইডহীন সান্দাকফু অভিযান (পর্ব-৮)

স্বপ্নের সান্দাকফু: মন খারাপের তিন দিন (পর্ব-৯)

স্বপ্নের সান্দাকফু: আশা-নিরাশার বরফ চূড়া (পর্ব-১০)

স্বপ্নের সান্দাকফু: জীবনের সেরা চার ঘণ্টা (পর্ব-১১)

স্বপ্নের সান্দাকফু: ট্রেকার্সদের স্বর্গ রুট-ফালুটের পথে (পর্ব-১২)

স্বপ্নের সান্দাকফু: পাহাড়ের চোখ রাঙানি আর দুর্ধর্ষতা (পর্ব-১৩)

প্রিয় ট্রাভেল/জিনিয়া/আজহার

প্রিয় ট্রাভেল সম্পর্কে আমাদের লেখা পড়তে ভিজিট করুন আমাদের ফেসবুক পেজে। যেকোনো তথ্য জানতে মেইল করুন [email protected] ঠিকানায়। ভ্রমণবিষয়ক আপনার যেকোনো লেখা পাঠাতে ক্লিক করুন https://www.priyo.com/post লিংকে।

 

Loading...
You might also like