Business is booming.

মরার আগেই ফান্ডের টাকা চান আইনজীবীরা

(প্রিয়.কম) সারা দেশে আইনজীবীর সংখ্যা প্রায় ৫০ হাজার। তাদের নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ বার কাউন্সিল। আইনজীবীদের কল্যাণে স্বায়ত্তশাসিত এই সংস্থার রয়েছে একটি বেনেভোলেন্ট (হিতৈষী) ফান্ড। কোনো আইনজীবীর মৃত্যুর পর সেই ফান্ডের অর্থ পান পরিবারের সদস্যরা। তবে এই অবস্থার পরিবর্তন দরকার বলে মনে করেন কয়েকজন আইনজীবী। তাদের দাবি, জীবদ্দশায় দিতে হবে ফান্ডের টাকা।

এ বিষয়ে সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী গৌরাঙ্গ চন্দ্র কর প্রিয়.কমকে বলেন, ‘আমাদের কল্যাণ তহবিল যা আছে, তার দ্বিগুণ করতে হবে। বার কাউন্সিলে ২০ তলা ভবন প্রয়োজন। সারা দেশে আইনজীবীদের চলাচলের জন্য বাসের ব্যবস্থা, জীবিত থাকা অবস্থায় আইনজীবীদের বেনেভোলেন্ট ফান্ডের ব্যবস্থা করতে হবে।

আইনজীবীদের নিরাপত্তা ও মর্যাদা দিতে হবে। সেটি সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট রুলসে বলা আছে। রুলস অনুযায়ী যে সকল আইনজীবী হাইকোর্টে ১০ বছর ধরে প্র্যাকটিস করেন, তাদেরকে হাইকোর্টে বিচারপতিদের সমান মর্যাদা দিতে হবে এবং জেলা জজ আদালতে যারা প্র্যাকটিস করছেন (১০ বছর ধরে), তাদেরকে জেলার জজদের সমান মর্যাদা দিতে হবে।’

সুবিধার বিষয়ে গৌরাঙ্গ আরও বলেন, ‘এগুলো আর্থিকভাবে নয়, হবে মানের দিক থেকে। আইনজীবীদের মর্যাদাবিষয়ক এ রায় দিয়েছিলেন সাবেক প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহা। কিন্তু সেই রায় আজও বাস্তবায়ন হয়নি।’

সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী অ্যাডভোকেট মোহাম্মদ ফারুক হোসেন বলেন, ‘এবারের নির্বাচনকে কেন্দ্র করে দেশের প্রায় ৪০টি বারে সফর করেছি। সাধারণ আইনজীবীরা বলছেন, বার কাউন্সিল থেকে তারা সুবিধা পাচ্ছেন না। তাদের অভিযোগ, বার কাউন্সিলের রেস্ট হাউসে থাকা যায় না। সেখানে ছারপোকার কামড়, ময়লা-অস্বাস্থ্যকর একটি পরিবেশ। সারা দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে রাজধানীতে কোনো কাজে আসলে আইনজীবীরা উঠেন তার নিজস্ব প্রতিষ্ঠান বার কাউন্সিলের নিজস্ব ভবনে। সেখানে ময়লা-আবর্জনা, অপরিষ্কার, অপরিচ্ছন্ন পরিবেশ, নোংরা অবস্থা দেখে অনেকেই চলে যান।

আইনজীবীরা তাদের সারা জীবনের জমানো টাকা শেষ বয়সে তুলে নিতে চান মারা যাওয়ার আগেই। আমার জানা মতে, একজন ল’ইয়ারও বেঁচে থাকা অবস্থায় বার কাউন্সিলের বেনেভোলেন্ট ফান্ডের টাকা পাননি। প্রতি ছয় মাস পরপর আইনজীবীদের সনদ পরীক্ষা নেওয়ার কথা রয়েছে। কিন্তু বার কাউন্সিল সেটি নিচ্ছে না। দেখা যাচ্ছে, দুই থেকে তিন বছর পরপর পরীক্ষা নেওয়া হচ্ছে। এতে নতুন আইনজীবী হতে বেগ পেতে হচ্ছে।’

ফারুক হোসেন অভিযোগ করে বলেন, ‘লোকাল বারে যারা ২০ বছর ধরে প্র্যাকটিস করছেন, কথা ছিল, তাদেরকে সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগে ওকালতি করার পারমিশন দেওয়া হবে। সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির সদস্য করে নেওয়া হবে। সে অনুযায়ী ২০১২ সালে বার কাউন্সিলের নির্বাহী কমিটি রেজুলেশন পাশ করা হয়। রেজুলেশন করে আইন মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়। কিন্তু আইন মন্ত্রণালয় সেটি অনুমতি দেয়নি। সরকারদলীয় আইনজীবীরা নির্বাচনকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন সময় বার কাউন্সিল ভবন নির্মাণের আশ্বাস দেন। কিন্তু সে আশ্বাসও বাস্তবায়ন করেনি কেউ।

বার কাউন্সিলে যে কয়েকবার নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে, তার মধ্যে ২০১২ সালে বিএনপিপন্থি আইনজীবীরা সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়েছে। বাকি সবসময়ই আওয়ামীপন্থিরা চেয়ারে বসেছেন। এ সময়ের মধ্যে আওয়ামীপন্থি আইনজীবীরা লোকাল বারগুলোতে ভোট চাইতে গিয়ে প্রতিশ্রুতি দিয়ে এসেছেন বহুতল ভবন নির্মাণ করবেন বার কাউন্সিলে। কিন্তু করেননি। এতে করে অনেক আইনজীবীর মনেই প্রশ্ন উঠেছে।’   

ফারুকের মতে, বার  কাউন্সিল নিয়ে ক্ষোভ রয়েছে স্থানীয় আইনজীবী সমিতির সদস্যদের। তারা বলছেন, বার কাউন্সিলের নেতারা নির্বাচনের আগে অনেক কথাই বলেন। কিন্তু কাজের ক্ষেত্রে তাদের দেওয়া প্রতিশ্রুতির যথাযথ মূল্যায়ন দেখা করা হয় না। অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের মতো বার কাউন্সিলে আইনজীবীদের শারীরিক অসুস্থতাসহ বিপদের দিনে এগিয়ে আসেন না। তাদের অভিযোগ, দেশের অন্যান্য পেশাজীবী সংগঠনে যেমন চিকিৎসা সেবা, ছেলেমেয়েদের লেখাপড়ার বিষয়ে বৃত্তি, বার্ষিক বিনোদনমূলক কর্মসূচি (ফ্যামিলি ডে, গেট টুগেদার) রয়েছে, বার কাউন্সিলে সেসব নেই।

ঢাকা বারের আইনজীবী অ্যাডভোকেট মহিউদ্দিন মহিম প্রিয়.কমকে অভিযোগ করে বলেন, ‘আগের মতো বার কাউন্সিল আইনজীবীদের নিয়ে কোনো শিক্ষামূলক, গঠনমূলক, পেশার উন্নয়নমূলক কাজ করে না। তারা কোনো বিশেষ প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করে না। কেন করে না, তা জানি না।

নবীন আইনজীবীদের পেশার মান উন্নয়নে প্রশিক্ষণ ও গবেষণার ব্যবস্থা করা জরুরি। বার কাউন্সিল সেদিকে মনোযোগ দিচ্ছে না।’

দলমত নির্বিশেষে বার কাউন্সিল সব আইনজীবীর কল্যাণে কাজ করবে, এমনটাই প্রত্যাশা করেন তরুণ এই আইনজীবী। 

উল্টো মতও আছে। বার কাউন্সিলের আটবারের নির্বাচিত নেতা সৈয়দ রেজাউর রহমান মুঠোফোনে প্রিয়.কমকে বলেন, ‘আইনজীবীদের সনদ দেওয়ার প্রতিষ্ঠান হলো বাংলাদেশ বার কাউন্সিল। এই সংস্থাটি আইনজীবীদের কল্যাণেও কাজ করে থাকে। সাধারণ আইনজীবীদের চাহিদা পূরণে এই সংগঠনটি চেষ্টা করে সর্বোচ্চ কাজ করার। মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তি আওয়ামী লীগের সরকার ক্ষমতায় থাকলে সাধারণ আইনজীবীদের জন্য অনেক কাজ করার চেষ্টা করে, যা অন্য সরকার করেন না।’

বার কাউন্সিলের অন্যান্য সুবিধা নিয়ে প্রশ্ন করতে চাইলে রেজাউর ব্যস্ততা আছে বলে মুঠোফোনের লাইনটি কেটে দেন।

বার কাউন্সিলের সাবেক ফাইন্যান্স কমিটির চেয়ারম্যান সানাউল্লাহ মিয়া প্রিয়.কমকে বলেন, ‘আইনজীবীদের চাহিদা অনুযায়ী কাজ করা কঠিন। কারণ বার কাউন্সিলের ইনকাম থেকেই তাদের বেনেভোলেন্ট ফান্ডের টাকা পরিশোধ করতে হবে।’

আইনজীবীদের চাহিদা মেটাতে বাস্তবতা অনেক কঠিন বলে মন্তব্য করে কাউন্সিলের সাবেক এই নেতা বলেন, ‘বার কাউন্সিলের আয়ের অন্যতম খাত হলো ওকালতনামা। একজন আইনজীবী যখন আদালতে কারো পক্ষে মামলায় লড়েন, তখন তাকে ১০ টাকা করে পরিশোধ করতে হয় একটি স্টিকারের মাধ্যমে। এটিসহ আরও অল্প কিছু আয় আছে বাংলাদেশে বার কাউন্সিলের। এই অল্প আয় দিয়ে আইনজীবীদের বেনেভোলেন্ট ফান্ড বাড়ানো কঠিন।’

সদ্য কমিটি থেকে বিদায় নেওয়া এই আইনজীবী বলেন, ‘আমরা (বিএনপিপন্থি আইনজীবী) বারের নির্বাচনে সংখ্যায় কম ছিলাম। আমাদের অনেক সিদ্ধান্ত মিটিংয়ে পাস হতো না। এ জন্য নির্বাচনের আগে আইনজীবীদের দেওয়া প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন করতে পারিনি। ২০১২ সালের কমিটিতে আমি বার  কাউন্সিলের ফাইন্যান্স কমিটির চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছি। অনেক বাস্তবতার পরও আমি জীবিত থাকা অবস্থায় আইনজীবীদের বেনেভোলেন্ট ফান্ডের টাকা পরিশোধের উদ্যোগ নিয়েছি।

আমরা আইনজীবীদের কল্যাণে আরও কিছু সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম। কিন্তু আমরা সেগুলো বাস্তবায়ন করতে পারিনি। যেমন: লোকাল বারে ২০ বছর প্র্যাকটিস করলে একজন আইনজীবীকে সুপ্রিম কোর্টে প্র্যাকটিস করার অনুমতি দেওয়ার বিষয়টি। আমরা কমিটির মিটিংয়ে সেটি পাস করিয়েছিলাম। কিন্তু সরকার সেটি গেজেট আকারে প্রকাশ করেনি। কারণ বার কাউন্সিলের অনেক রুলস সরকারের নিয়ন্ত্রণে।’

সনাউল্লাহ আরও বলেন, ‘বার কাউন্সিলের আইনজীবীদের জন্য একটি এফডিআর করানো জরুরি, তাহলে তারা নিশ্চিন্তে থাকতে পারবেন আর্থিক সহযোগিতার বিষয়ে।’

আগামী ১৪ মে বার কাউন্সিল নির্বাচন অনুষ্ঠানের জন্য শিডিউল (সময়সূচি) ঘোষণা করা হয়েছে। সে হিসেবে সরকারদলীয় (আওয়ামী লীগপন্থি) আইনজীবীদের পাশাপাশি প্যানেল ঘোষণা করেছে বিএনপি-জামায়াতপন্থি আইনজীবীরা। আওয়ামী লীগপন্থি আইনজীবীরা বঙ্গবন্ধু আওয়ামী আইনজীবী পরিষদ, আর বিএনপিপন্থি আইনজীবীরা ব্যবহার করছেন জাতীয়তাবাদী আইনজীবী ঐক্য প্যানেল নামের ব্যানার।

এবারের নির্বাচনে বঙ্গবন্ধু আওয়ামী আইনজীবী পরিষদ থেকে গঠিত প্যানেলের নেতৃত্ব দিচ্ছেন বার কাউন্সিলের (সদ্য বিদায়ী) ভাইস চেয়ারম্যান আব্দুল বাসেত মজুমদার। বাসেত মজুমদার কেন্দ্রীয় আওয়ামীলীগের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য। তার সঙ্গে একই প্যানেলে রয়েছেন আরও ১৩ জন আওয়ামীপন্থি আইনজীবী।

অপরদিকে জাতীয়তাবাদী আইনজীবী ঐক্য প্যানেলের নেতৃত্ব দিচ্ছেন সাবেক অ্যাটর্নি জেনারেল আবু জামিল মোহাম্মাদ আলী (এজে মোহাম্মাদ আলী)। তিনি বিএনপির চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য। একইভাবে এ প্যানেলে এজে মোহাম্মাদ আলীর সঙ্গে রয়েছেন আরও ১৩ আইনজীবী। 

এবারের নির্বাচনে ভোটাররা প্রার্থীদের কাছে যেসব দাবি করছেন, তার মধ্যে রয়েছে আইনজীবীদের কল্যাণ তহবিলের অর্থ বৃদ্ধি, বার কাউন্সিলের ২০ তলা ভবন নির্মাণ, সারা দেশে আইনজীবীদের চলাচলের সুবিধার জন্য বাসের ব্যবস্থা, জীবিত থাকা অবস্থায় বেনেভোলেন্ট ফান্ডের টাকা পরিশোধ, আইনজীবীদের নিরাপত্তার পাশাপাশি হাইকোর্টে ১০ বছর প্র্যাকটিসের অভিজ্ঞতা থাকলেই হাইকোর্টের বিচারপতিদের সমান মর্যাদা, একইভাবে জেলা জজ আদালতে ১০ বছর প্র্যাকটিসের অভিজ্ঞতা থাকলে জেলা জজদের সমান মর্যাদা দেওয়া।

বার কাউন্সিল অ্যাক্ট অনুযায়ী, প্রতি তিন বছর পর এই সংস্থাটি পরিচালনা করতে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। ১৫ সদস্য বিশিষ্ট এই কমিটির চেয়ারম্যান পদাধিকার বলে বাংলাদেশের অ্যাটর্নি জেনারেল। বাকি ১৪ জন সারা দেশের আইনজীবীদের ভোটের মাধ্যমে নির্বাচিত হন। 

প্রিয় সংবাদ/আজাদ/আজহার

Loading...
You might also like